ফাল্গুন কৃষ্ণ চতুর্দশীর গভীর রাত্রি—হিন্দু সাধনাপদ্ধতিতে এই সময়টিকে ধরা হয় এক বিশেষ আধ্যাত্মিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে। এই তিথিতেই পালিত হয় মহাশিবরাত্রি—যা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং ভক্তি, ত্যাগ, সংযম ও চেতনার জাগরণের প্রতীক। ভগবান শিব-এর উপাসনার এই রাত্রি যুগযুগান্তর ধরে ভারতীয় সংস্কৃতিতে গভীর তাৎপর্য বহন করে আসছে।
শিবের মহারাত্রি কেন?
পুরাণে মহাশিবরাত্রিকে ঘিরে একাধিক কাহিনি প্রচলিত।
শিব পুরাণ-এ বর্ণিত আছে, এই রাত্রিতেই শিব লিঙ্গরূপে অনন্ত জ্যোতির স্তম্ভ হিসেবে প্রকাশিত হন—যার আদি বা অন্ত খুঁজে পাননি ব্রহ্মা ও বিষ্ণু। এই কাহিনি শিবের অনন্ত, নিরাকার ও সর্বোচ্চ চেতনার প্রতীক।
আরেকটি মতে, এই তিথিতেই দেবী পার্বতীর সঙ্গে শিবের বিবাহ সম্পন্ন হয়। ফলে এই দিনটি দাম্পত্য মঙ্গল ও শাশ্বত প্রেমেরও প্রতীক।
কিছু শৈব আগম মতে, এই রাত্রি হলো শিবের তাণ্ডবের রাত্রি—যেখানে সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের মহাসংগীত ধ্বনিত হয়।
উপবাসের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
উপবাস শব্দের অর্থ কেবল না খাওয়া নয়—“উপ” মানে নিকট, “বাস” মানে অবস্থান করা। অর্থাৎ ঈশ্বরচেতনার নিকটে অবস্থান করাই প্রকৃত উপবাস।
মহাশিবরাত্রিতে উপবাস পালন মানে ইন্দ্রিয়সংযমের মাধ্যমে মনকে শুদ্ধ করা। সারাদিন ফলাহার বা নির্জলা উপবাস রেখে ভক্তরা চেষ্টা করেন—
মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা
ক্রোধ, লোভ, অহংকার দমন করা
জপ ও ধ্যানের মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি জাগ্রত করা
শাস্ত্র মতে, এই উপবাস পাপক্ষয় ও মানসিক পরিশুদ্ধির এক বিশেষ মাধ্যম।
নারীরা কেন পালন করেন?
ভারতীয় সমাজে বহু অবিবাহিতা ও বিবাহিতা নারী মহাশিবরাত্রি ব্রত পালন করেন। এর পেছনে রয়েছে পৌরাণিক ও সামাজিক দু’ধরনের কারণ।
দেবী পার্বতী কঠোর তপস্যার মাধ্যমে শিবকে স্বামীরূপে লাভ করেছিলেন—এই কাহিনি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অবিবাহিতারা আদর্শ জীবনসঙ্গী প্রার্থনা করেন।
বিবাহিত নারীরা স্বামীর দীর্ঘায়ু, দাম্পত্য সুখ ও সংসারের মঙ্গল কামনায় এই ব্রত পালন করেন। তবে বর্তমান সময়ে অনেক নারী-পুরুষই আধ্যাত্মিক উন্নতির উদ্দেশ্যে এই উপবাস রাখেন—যা কেবল পারিবারিক কল্যাণ নয়, ব্যক্তিগত আত্মোন্নয়নের সঙ্গেও যুক্ত।
রাত্রিজাগরণের মহাত্ম্য: কেন জেগে থাকা?
মহাশিবরাত্রির প্রধান আচার হলো রাত্রিজাগরণ।
এই রাত্রিকে বলা হয় “চেতনার জাগরণের রাত্রি।” সাধারণত মানুষ রাত্রিতে ঘুমিয়ে অবচেতন অবস্থায় থাকে। কিন্তু এই বিশেষ তিথিতে জেগে থেকে শিবনাম জপ, ধ্যান ও কীর্তনের মাধ্যমে মনকে জাগ্রত রাখা হয়।
শাস্ত্র মতে, এই রাতে চার প্রহরে শিবলিঙ্গে অভিষেক করলে বিশেষ ফল লাভ হয়। প্রতিটি প্রহর মানুষের জীবনের একেকটি স্তরের প্রতীক—
• জাগ্রত
• স্বপ্ন
• সুপ্ত
• তুরীয় (চতুর্থ চেতনাস্থা)
এই তুরীয় অবস্থাই শিবতত্ত্বের সঙ্গে মিলনের প্রতীক। তাই রাত্রিজাগরণ মানে কেবল না ঘুমানো নয়—আত্মসচেতনতার পথে এগিয়ে যাওয়া।
কীভাবে পালন করা উচিত?
মহাশিবরাত্রি পালনের ক্ষেত্রে আড়ম্বরের চেয়ে ভক্তিই মুখ্য।
সাধারণ পালন পদ্ধতি:
সকালে স্নান করে পরিষ্কার বস্ত্র পরিধান
শিবলিঙ্গে জল, দুধ ও বেলপাতা অর্পণ
“ওঁ নমঃ শিবায়” মন্ত্র জপ
সন্ধ্যা থেকে রাত্রি পর্যন্ত কীর্তন বা ধ্যান
পরদিন প্রাতঃকালে ব্রত ভঙ্গ
অসুস্থ বা বয়স্কদের জন্য কঠোর নির্জলা উপবাস প্রয়োজন নেই। সংযম ও মনোনিবেশই আসল উদ্দেশ্য।
সামাজিক ও দার্শনিক গুরুত্ব
মহাশিবরাত্রি সমাজে সংযম, সমতা ও সরলতার বার্তা দেয়। শিব এমন এক দেবতা যিনি রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র সকলের জন্য সমান। তাঁর ভস্মমণ্ডিত রূপ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—জীবন ক্ষণস্থায়ী, অহংকার অর্থহীন।
দর্শনের দৃষ্টিতে শিব হলেন চেতনার প্রতীক। এই রাত্রি আমাদের শেখায়—অন্ধকারের মধ্যেই আলোর অনুসন্ধান করতে হয়।
মহাশিবরাত্রি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি আত্মসংযম, ভক্তি ও চেতনার গভীর উপলব্ধির এক সাধনাপর্ব। উপবাস শরীরকে নিয়ন্ত্রণে আনে, রাত্রিজাগরণ মনকে জাগ্রত করে, আর শিবচিন্তন আত্মাকে প্রসারিত করে।
এই রাত্রি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাহ্যিক আচার যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, অন্তরের পবিত্রতাই আসল পূজা। শিবতত্ত্ব উপলব্ধির সেই পথেই মহাশিবরাত্রির প্রকৃত মাহাত্ম্য নিহিত।
নিজের সংস্কৃতি নিজের ঘর।
চোখ রাখুন ব্লগে “শ্রীডক্টর”।
About Sri Yoga Center: A charitable trust in Kunarpur, Bankura devoted to Yoga, Ayurveda, Indology, and cultural research.
Know more •
Official Blog •
YouTube




