Posted on Leave a comment

শ্রীমদ্ স্বামী অখণ্ডানন্দজী মহারাজ

কিঙ্কর রামেশানন্দজী( রামেশ্বর ডাগা) লিখছেন :
বৃন্দাবনে জে কে পরিবারের মন্দিরে দীর্ঘদিনের অতিথি ছিলেন ভারত বন্দিত মহাত্মা—-শ্রীমদ্ স্বামী অখণ্ডানন্দজী মহারাজ | তিনি ছিলেন ভগবদ্দ্রষ্টা সর্ব্বশাস্ত্রজ্ঞ মহাপুরুষ | সেবার তাঁর জন্মোৎসব এ তাঁর বিরাট আশ্রমে ভারতপূজ্য শঙ্করাচার্য্যজী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছিলেন অসংখ্য বিদ্বান ও সন্তমন্ডলী | জে কে পরিবারের সঙ্গে পূজ্য অখণ্ডানন্দজীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল | জে কে পরিবারের গৃহবধূ এ দাসের কনিষ্ঠা কন্যা সুনন্দা প্রসঙ্গক্রমে অখণ্ডানন্দজীর কাছে জানায় যে সে শ্রীশ্রীবাবার কৃপাশ্রয় লাভে ধন্য | স্বামীজী সঙ্গে সঙ্গেই গভীর আকুতি নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—-“তাহলে তোমার মাথায় যখন তিনি হাত দিয়েছিলেন, তখন তোমার নিশ্চয় কিছু অনুভূতি হয়েছিল?” শ্রীশ্রীবাবার উপর তাঁর কি অবিচলিত বিশ্বাস! একবার বোম্বেতে ভুলাভাই অডিটোরিয়াম এ সহস্র সহস্র শ্রোতৃমণ্ডলীর কাছে প্রবচন করছিলেন অখণ্ডানন্দজী | প্রভুকে কোন ভক্ত সেখানে নিয়ে যান | স্বামীজী স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে শ্রীশ্রীবাবার একটি হাত নিজের মস্তকে তুলে নিয়ে সমবেত ভক্তমণ্ডলীর উদ্দেশ্যে বললেন,—“ইনকা হাত জিসকে মাথে পর জায়েগা, উসিকা কল্যাণ |”
*** মহাত্মা প্রভুদত্ত ব্রহ্মচারীজী একবার “জাহ্নবীকুঞ্জে ” শ্রীশ্রীবাবার দর্শনে এলেন | বাবার নিয়মানুসারে তাঁকে চৌকিতে বসানো হল | বাবা বললেন,—“ব্রহ্
মচারীজীর চরণ ধুইয়ে দে |” শ্রীমৎ প্রভুদত্তজী প্রবল আপত্তি জানালেন—-“শ্র
ীভগবানকা সামনে চরণ নেহি ধোলায়েগা |” শ্রীশ্রীবাবা আবার একই আদেশ করলেন | ওঁর কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা | শ্রীশ্রীবাবার সম্মুখে চরণ প্রক্ষালন করতে দিলেন না |
****বিশ্ববিশ্রুত মহাত্মা “Divine Life Society ” র কর্ণধার শ্রীমদ্ চিদানন্দজী মহারাজের ও শ্রীশ্রীবাবার প্রতি ভক্তির তুলনা ছিলনা | শ্রীশ্রীবাবাকে তিনি গুরুবৎ শ্রদ্ধা করতেন, দণ্ডবৎ প্রণাম করতেন, আর বলতেন, ” আপনি ও আমার দীক্ষাদাতা আচার্য্য আমার কাছে অভিন্ন |”হৃষিকেশ আশ্রমে বাসন্তী পূজা বা দুর্গাপূজার সময় শ্রীমদ্ চিদানন্দজী হৃষিকেশে অবস্থান কালে সশ্রদ্ধভাবে উপস্থিত থাকতেন | একবার ওঁকে নিমন্ত্রণ করতে গেছি, তারকদাও( তৎকালীন সংঘ সর্ব্বাধীশ) সঙ্গে আছেন | গিয়ে দেখি শতাধিক বিদেশী দীক্ষার্থী এসেছেন | আমাদের আবেদন শুনে স্বামীজী সশ্রদ্ধভাবে বললেন —” দেখুন যাবো | তবে এতজন রয়েছেন এখানে——any way I shall pinch out some time “. শ্রীমদ্ চিদানন্দজী এসেছিলেন শুধু নয়, শ্রীশ্রীবাবার ধ্যানকক্ষের সম্মুখে ধ্যানস্থ হয়ে তিনি দন্ডায়মান থাকতেন ও শ্রীশ্রীবাবার উদ্দেশ্যে পরে শ্রীশ্রীবাবার উদ্দেশ্যে সাষ্টাঙ্গে প্রণতি জানাতেন দীর্ঘক্ষণ | এটি তাঁর দীর্ঘ অনুসৃত অভ্যাস |শ্রীশ্রীবাবাকে তিনি শ্রীভগবানের অবতার বলেই মান্য করতেন | এক প্রবন্ধে লিখেছেন ” Baba’s advent and presence in this age is of utmost significance to India as well as the whole world…….After several centuries Babajee has now come to revive and give fillip to this all important saving and liberating work commenced by Mahaprabhu….. Boloved Babajee is verily “Namabatara”.

সূত্র —জয় রাজরাজেশ্বর !!
by– Aniruddha Chakraborty
Posted on Leave a comment

সুস্বাদু সিঙ্গারা ও জন্ম বৃত্তান্ত

ঠাণ্ডা লুচি বারংবার ফেরত পাঠানোয় রাজবাড়ির হালুইকর অনুমতি চেয়েছিলেন রাজসভায় মিষ্টান্ন পাঠাতে। রাজচিকিৎসকের পরামর্শে মধুমেহ রোগাক্রান্ত রাজা অগ্নিশর্মা হয়ে শূলে চড়ানোর হুকুম দিয়েছিলেন হালুইকরকে। অনেক অনুনয় বিনয় করে নিজের প্রাণ রক্ষা করেছেন হালুইকর। রাজা আদেশ দিয়েছেন – হালুইকরকে তিনরাত্রের মধ্যে দেশত্যাগ করতে।
দ্বিতীয় রাত্রে হালুইকরের স্ত্রী ঠিক করেছে দেশত্যাগের আগে একবার দেখা করবে রাজার সাথে। সেইমতো তৃতীয়দিন সকাল বেলা রাজদরবারে এসে প্রণাম জানালো স্বয়ং রাজামশাইকে। রাজসভায় আসার কারণ জিজ্ঞেস করায়, রাজাকে জানায় – সে নাকি এমনভাবে লুচি তরকারি করতে পারে, যা রাজা আধঘন্টা বাদে খেলেও গরম পাবেন। এজাতীয় লুচি এবং তরকারি নাকি কিছুক্ষণ বাদে খাওয়াই দস্তুর।
সন্দিহান রাজা কিঞ্চিৎ কৌতূহলী হয়ে হালুইকরের স্ত্রীকে পাঠালেন পাকশালে। জানিয়ে দিলেন যখন রাজসভা থেকে খবর যাবে তৎক্ষণাৎ পাকশাল থেকে খাবার পৌঁছনো চাই। হালুইকরের স্ত্রী মৃদু হেসে মহারাজকে জানিয়েছিলো – খাদ্যদ্রব্য রাজসভায় তৎক্ষণাৎই পৌঁছবে, কিন্তু অনুগ্রহ করে তিনি যেন কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে খান – অন্যথায় মহামান্য রাজকীয় জিহ্বা পুড়ে যেতে পারে। বিস্মিত মহারাজের সামনে দিয়ে হাস্যমুখে হালুইকরের স্ত্রী চলে গেল পাকশালে।
রাজ-পাচক আলুর তরকারি তৈরি করে পাকশালে দাঁড়িয়ে কাঁপছেন, হুকুম এলেই লুচি ভাজতে হবে। ময়দার তাল মাখা রয়েছে হাতের সামনে। হালুইকরের স্ত্রী পাচককে কটাক্ষ করে বসলো ময়দার তাল নিয়ে। লেচি কেটে লুচি বেলে, কাঁচা ময়দার ভেতর লুচির জন্য তৈরি সাধারণ তরকারি ভরে দিয়ে, সমভুজাকৃতি ত্রিভুজের গড়ন বানিয়ে আড়ষ্ঠ রাজ পাচকের সামনে নিজের আঁচল সামলে শুরু করলো চটুল গল্প।
রাজাজ্ঞা আসতেই তরকারির পুর ভর্তি দশটি ত্রিভুজাকৃতির লুচির ময়দা ফুটন্ত ঘি ভর্তি কড়ায় ফেলে দিয়ে, নিমেষের মধ্যে সোনালী রঙের ত্রিভুজগুলি তুলে নিয়ে স্বর্ণথালায় সাজিয়ে নিজেই চললো রাজসভায়।
মহারাজ এরূপ অদ্ভুত দর্শন খাদ্যবস্তু দেখে স্তম্ভিত। হালুইকরের স্ত্রী অত্যন্ত বিনীতভাবে জানালো – খাদ্যদ্রব্যটির নাম সমভুজা। মহারাজ যেন সম্পূর্ণ বস্তুটি মুখে না ঢুকিয়ে একটি কামড় দিয়ে দেখেন – ঠাণ্ডা না গরম এবং অনুগ্রহ করে স্বাদটি জানান।
মহারাজ স্বাদ জানাননি। তিনি তিনছড়া মুক্তো মালা খুলে হালুইকরের স্ত্রীয়ের হাতে দিয়েছিলেন। রাজবাড়ির হালুইকরের দণ্ডাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছিলেন। প্রায় ছ’মাস পর হেসে উঠেছিলেন মহারাজ, শান্তি পেয়েছিলো তামাম প্রজাকুল।
মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র। ১৭৬৬ সালে কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার রাজ-হালুইকর, কলিঙ্গ তথা বর্তমান ওড়িষ্যা থেকে আগত গুণীনাথ হালুইকরের ষষ্ঠপুত্র গিরীধারী হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী দেবী আবিষ্কার করেছিলেন সিঙ্গাড়া।
শাক্ত সাধক, পরবর্তিকালে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি রামপ্রসাদ, স্বয়ং সন্ধ্যাহ্নিক সেরে প্রতিসন্ধ্যায় বসতেন একথালা সিঙ্গাড়া নিয়ে।
দোলপূর্ণিমার সন্ধ্যায়, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের দরবার থেকে বাইশটি সুসজ্জিত হস্তী ভেট নিয়ে গিয়েছিলো উমিচাঁদের কাছে – বাইশটি স্বর্ণথালা ভর্তি বাইশশোটি সিঙ্গাড়া।
ভারতীয় খাদ্য হিসেবে সিঙ্গাড়ার সাথে রবার্ট ক্লাইভের প্রথম সাক্ষাৎ হয়, এই মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রেরই সৌজন্যে।
সিঙ্গাড়ার জন্য ইতিহাস স্বীকৃতি দিয়েছে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে। নাম ভুলে গেছে তাঁর প্রধান হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী বেহারার।
ইংরিজিতে বলে, কমন সেন্স মেকস্ আ ম্যান আনকমন। ধরিত্রীদেবী সাধারণ বুদ্ধি খাটিয়ে আবিষ্কার করেছিলেন এই অসাধারণ খাদ্যদ্রব্যটির, যেটি সেই ১৭৬৬ সাল থেকে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলা তথা সারা ভারতে।
ঐতিহাসিকদের মতে, এর বহু আগে, নবম শতাব্দীতে পারস্যের অধিবাসীরা যব এবং ময়দার তালের সঙ্গে গাজর কড়াইশুঁটি রসুন ও মাংস মেখে সেঁকে খেতো, যাকে বর্তমান সিঙ্গাড়ার জনক হিসাবে ধরা হলেও, সুদূর পারস্য থেকে ভারতবর্ষে এসেও তাঁরা ময়দার তালে মাংসের কুঁচি ঢুকিয়ে সেঁকেই খেতেন। এরও বহুপরে তাঁরা ভারতবর্ষের উত্তরপূর্ব উপকূলে বিভিন্ন মশলা সহযোগে তৈরি আলুর তরকারি, ময়দার ভেতর ঢুকিয়ে ঘিয়ে ভাজার পদ্ধতিতে চমৎকৃত হ’ন।
ডায়বেটিক পেশেন্টদের ঘন ঘন খিদে পায়। চিকিৎসাবিজ্ঞান উন্নত হয়েছে। ডাক্তাররা বলছেন, অনেকক্ষণ অন্তর একসাথে প্রচুর পরিমানে না খেয়ে, ক্যালোরি মেপে কিছুক্ষণ অন্তর অল্পসল্প খাবার খেতে। কিন্তু সেযুগে ডাক্তারবাবুদের হৃদয় ছিলো বিশাল। মধুমেহ রোগীরা তখন তেল ঘি মশলা, ভাজা খেলেও তাঁরা রাগ করতেন না। নিশ্চিতভাবেই আজকের যুগে ডাক্তার বাবুরা আঁতকে উঠবেন যদি দেখেন কোনো ডায়াবেটিক পেশেন্ট প্রতিঘন্টায় সিঙ্গাড়া ওড়াচ্ছেন, তবু, আঁটকানো যায়নি সিঙ্গাড়াকে।
শহুরে অভিজাত পরিবারের বৈঠকখানায় মোটা গদির সোফায় বসা অতিথির থালাই হোক বা প্রত্যন্ত গ্রামের জরাজীর্ণ চায়ের দোকানের সামনে নড়বড়ে বাঁশের বেঞ্চে রাখা তেলচিটে কালো ভাঙ্গা বেতের চুবড়ি – বিকেল সাড়ে চারটেই হোক বা সকাল পৌনে দশটা, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রধান হালুইকরের স্ত্রীর উদ্ভাবনটি সর্বত্র সর্বদা সর্বগামী।
যা রাজসভায় রাজ-সম্মুখে পরিবেশিত হয়, তার কৌলীন্য প্রশ্নাতীত হবে – এই তো স্বাভাবিক।
ভাষাবিদদের মতে, সমভুজা–> সম্ভোজা–> সাম্ভোসা–> সামোসা।
মতান্তরে, সমভুজা–> সম্ভোজা–> সিভুসা–> সিঁঙুরা(নদীয়ার কথ্যভাষার প্রভাবে)–> সিঙ্গাড়া।
সংগৃহীত।