...

কোনদিকে করবেন রান্নাঘর – বাড়ির জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা

Spread the love

IMG 20260119

 

মানুষের বসতবাড়িতে রান্নাঘর সব সময়ই একটি বিশেষ স্থান দখল করে এসেছে। প্রাচীন ভারতীয় গৃহস্থালিতে রান্নাঘরকে শুধুমাত্র খাদ্য প্রস্তুতির জায়গা হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে পরিবারের প্রাণশক্তির উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বৈদিক যুগে অগ্নিকে দেবতার মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, আর সেই অগ্নির নিয়মিত অবস্থান ছিল গৃহের রান্নাঘর। তাই এই জায়গাটির অবস্থান, দিক ও শুদ্ধতা নিয়ে তখন থেকেই নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি হয়।

বাস্তু অনুযায়ী রান্নাঘরের জন্য দক্ষিণ–পূর্ব দিককে শ্রেষ্ঠ বলা হয়, কারণ এই দিকটি অগ্নির স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত। সূর্যের গতিপথ অনুযায়ী দিনের প্রথম তাপ ও আলো এই দিকেই বেশি পড়ে। প্রাচীন মানুষরা যদিও আধুনিক জ্যামিতি জানত না, কিন্তু তারা প্রকৃতির ছন্দ বুঝে ঘর বানাত। রান্নাঘরকে এমন জায়গায় রাখা হত, যাতে আগুনের তাপ বাড়ির বাকি অংশে অস্বস্তি তৈরি না করে এবং ধোঁয়া সহজে বেরিয়ে যেতে পারে।

এই বাস্তু ভাবনার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক যুক্তিও ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়। রান্নার সময় তাপ, ধোঁয়া, তেলকণা ও জলীয় বাষ্প তৈরি হয়, যা যদি দীর্ঘ সময় আটকে থাকে তাহলে শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা, চোখে জ্বালা ও ছত্রাকের জন্ম দিতে পারে। সূর্যালোক ও বাতাস চলাচল থাকা রান্নাঘরে এই সমস্যা অনেক কম হয়। আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞান আজ যে ভেন্টিলেশন ও ন্যাচারাল লাইটের কথা বলে, তা আসলে প্রাচীন গৃহপরিকল্পনার অভিজ্ঞতারই আধুনিক ভাষ্য।

রান্নাঘরের সঙ্গে মানসিক অবস্থার সম্পর্কও গভীর। প্রতিদিনের খাবার তৈরি হয় এখানে, আর খাবার মানেই যত্ন ও সম্পর্কের প্রকাশ। অন্ধকার, গরম ও বিশৃঙ্খল রান্নাঘরে কাজ করলে মানুষ অজান্তেই ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়ে, যার প্রভাব খাবারের উপরও পড়ে। অন্যদিকে পরিষ্কার, আলো–বাতাসপূর্ণ রান্নাঘরে রান্না করলে মন শান্ত থাকে, ধৈর্য বাড়ে। তাই প্রাচীন প্রথায় রান্নার আগে হাত-মুখ ধোয়া, চুল বেঁধে নেওয়া বা নীরব থাকার ধারণাগুলো আসলে মানসিক প্রস্তুতিরই অংশ।

রান্নাঘরে আগুন ও জলের আলাদা অবস্থান নিয়েও বহু নিয়ম দেখা যায়। বাস্তুতে এটাকে বিপরীত শক্তির ভারসাম্য বলা হলেও, দৈনন্দিন ব্যবহারে এর ব্যবহারিক গুরুত্ব স্পষ্ট। চুলার পাশে জল থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে, আবার ভেজা জায়গায় আগুনের কাজ অস্বস্তিকর হয়। তাই কাজের সুবিধা ও নিরাপত্তার জন্যই এই বিভাজন দীর্ঘদিন ধরে মানা হয়ে আসছে।

প্রাচীন গ্রামবাংলায় রান্নাঘর সাধারণত একটু নিচু ও আলাদা ঘরে হত। এর কারণ শুধু সামাজিক নয়, পরিবেশগতও ছিল। নিচু ঘরে তাপ জমে থাকত না, আর রান্নার ধোঁয়া সহজে বাইরে চলে যেত। রান্নাঘরে গবাদিপশুর গোবর দিয়ে লেপ দেওয়া হত, যা জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করত এবং পোকামাকড় দূরে রাখত। আজ যাকে আমরা হাইজিন বলি, তখন সেটাই ছিল দৈনন্দিন অভ্যাস।

আজকের আধুনিক ফ্ল্যাটেও রান্নাঘরের গুরুত্ব কমেনি, শুধু রূপ বদলেছে। চিমনি, এক্সহস্ট ফ্যান, সানলাইট—সবকিছু মিলিয়ে আমরা আসলে সেই পুরনো ধারণাগুলোকেই নতুন প্রযুক্তিতে ব্যবহার করছি। তাই রান্নাঘর সংক্রান্ত নিয়মগুলো কুসংস্কার নয়, বরং মানুষের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনের ফল।

এই কারণে রান্নাঘরকে শুধুমাত্র বাস্তু বা বিজ্ঞান দিয়ে বিচার করলে পুরো ছবিটা ধরা পড়ে না। এখানে আছে প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জ্ঞান, আছে শরীরের সুস্থতার চিন্তা, আছে মনের শান্তির প্রয়োজন। রান্নাঘর তাই শুধু খাবার তৈরির জায়গা নয়—এটি একটি বাড়ির নীরব কেন্দ্র, যেখানে প্রতিদিন জীবন গড়ে ওঠে।

নিজের সংস্কৃতি নিজের ঘর।
চোখ রাখুন ব্লগে “শ্রীডক্টর”।

 


About Sri Yoga Center: A charitable trust in Kunarpur, Bankura devoted to Yoga, Ayurveda, Indology, and cultural research.
Know more
Official Blog
YouTube


Spread the love

Leave a Reply

Skip to toolbar