...

যমুনার হাতের সেই প্রথম ফোঁটা: এক প্রাচীন ঐতিহ্য, যা আজও আমদের ঘরে ঘরে

Spread the love

Bhaiphota

 

ভাইফোঁটা—একটা ছোট্ট ফোঁটা, কিন্তু তার ভেতর লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ঐতিহ্য, ভালোবাসা আর আশীর্বাদের শক্তি। এই রীতির শিকড় খুঁজলে আমরা পৌঁছে যাই দেবলোকের এক হৃদয়স্পর্শী কাহিনির দিকে, যেখানে শুরু হয়েছিল ভাই-বোনের এই চিরন্তন বন্ধনের গল্প।

 

ভাইফোঁটার আধ্যাত্মিক দিক : যম ও যমুনার কাহিনি

পুরাণ অনুসারে, সূর্যদেব ও ছায়াদেবীর দুই সন্তান ছিলেন—যম (মৃত্যুর দেবতা) ও যমুনা (এক পবিত্র নদীর দেবী)।
দীর্ঘকাল যম তার বোন যমুনার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। একদিন যমুনা তাঁর ভাইকে আন্তরিকভাবে নিমন্ত্রণ করেন, এবং যম অবশেষে তাঁর বাড়িতে যান।

যমুনা সেদিন স্নান করে পবিত্রভাবে পুজো সেরে ভাইয়ের কপালে চন্দনের ফোঁটা দেন, দুর্বা ও প্রদীপ জ্বালিয়ে আশীর্বাদ করেন তাঁর দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনায়।
যম এই ভালোবাসায় এতটাই আপ্লুত হন যে, তিনি প্রতিশ্রুতি দেন—যে দিন বোন ভাইকে স্নেহভরে ফোঁটা দেবে, সেদিন মৃত্যুর কোনো ভয় থাকবে না।

পুরাণ অনুযায়ী উৎপত্তি 

ভাইফোঁটার উৎস খুঁজে পাওয়া যায় স্কন্দপুরাণ ও ভবিষ্যপুরাণ-এর কাহিনিতে। সেখানে বলা হয়েছে, মৃত্যুর দেবতা যম একদিন দীর্ঘ সময় পর তাঁর বোন যমুনা-র সঙ্গে দেখা করতে আসেন। বোন স্নেহভরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়ে কপালে ফোঁটা দেন এবং তাঁর দীর্ঘায়ুর কামনা করেন।

যম খুশি হয়ে বলেন, “আজকের দিন থেকে যে বোন তার ভাইকে স্নেহভরে ফোঁটা দেবে, তার ভাই অমঙ্গল থেকে রক্ষা পাবে।” সেই দিনটি ছিল কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথি, যাকে আজ আমরা ভাইফোঁটা বা যমদ্বিতীয়া নামে জানি।

এই বিশ্বাস থেকেই আজও ভাইফোঁটার দিনে বোনেরা ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দেন, যেন ভাই সুস্থ, দীর্ঘায়ু ও অমঙ্গলমুক্ত থাকেন।

 

ভাইফোঁটার প্রাচীন উৎস: স্নেহ ও সুরক্ষার প্রতীক

পরে এই দেবলোকীয় বিশ্বাস ক্রমে মানুষের সমাজে প্রবেশ করে। প্রাচীন আর্য সমাজে বোনেরা তাদের ভাইদের যুদ্ধে যাওয়ার আগে চন্দন বা হলুদের ফোঁটা লাগিয়ে আশীর্বাদ দিতেন—“অমঙ্গল দূর হোক, তুমি নিরাপদে ফিরে আসো।”
এই আশীর্বাদ ও আধ্যাত্মিক রীতিই ক্রমে আজকের ঘরোয়া ভাইফোঁটার রূপ নিয়েছে।

 

ভাইফোঁটার প্রতিটি উপকরণের গভীর অর্থ

প্রতিটি উপকরণের পেছনেই আছে এক একটি বিশ্বাস, এক একটি আর্শীবাদ—

🔸 চন্দন – শান্তি ও শুদ্ধতার প্রতীক

চন্দনের ফোঁটা ঠান্ডা, প্রশান্তি দেয়, আর নেতিবাচক শক্তি দূর করে। বোনের দেওয়া চন্দনের ফোঁটা যেন ভাইয়ের জীবনে শান্তি ও স্থিরতার আশীর্বাদ।

🔸 দুর্বা ঘাস – দীর্ঘায়ুর আশীর্বাদ

দুর্বা প্রাচীনকাল থেকেই অমরত্বের প্রতীক। বোনেরা বিশ্বাস করেন, দুর্বা দিয়ে ফোঁটা দিলে ভাইয়ের জীবনে দীর্ঘায়ু ও সৌভাগ্য আসে।

🔸 সিঁদুর বা রক্তচন্দন – স্নেহের রং

লাল রং জীবনের, ভালোবাসার এবং রক্তের প্রতীক। বোনের এই ফোঁটা বোঝায়—ভাই তার হৃদয়ের এক অংশ।

🔸 মিষ্টি – মধুর সম্পর্কের প্রতীক

ফোঁটার পর ভাইকে মিষ্টি খাওয়ানো মানে, জীবনের সব তিক্ততা দূর করে সম্পর্ক যেন মিষ্টিতে ভরে থাকে।

🔸 প্রদীপ – আলো ও শক্তির প্রতীক

প্রদীপ জ্বালানো হয় অশুভ শক্তি দূর করতে। আলো যেমন অন্ধকার দূর করে, তেমনি বোনের ভালোবাসা ভাইয়ের জীবনের ছায়া দূর করুক—এই বিশ্বাস আজও বহমান।

🔸 ডালা বা থালা – ঐশ্বর্যের প্রতীক

ফোঁটার সাজানো থালা বা ডালা পূর্ণতার প্রতীক। এতে থাকে ফোঁটার সমস্ত উপকরণ—চন্দন, দুর্বা, প্রদীপ, মিষ্টি—যা সমৃদ্ধি ও শুভ শক্তির প্রতীক।

 

এক প্রথা, যা কালের স্রোতেও অমলিন

সময় যতই বদলাক, ভাইফোঁটার মর্মবস্তু বদলায় না। ডালা বদলে থালা, চন্দনের বদলে তিলক—তবু ভালোবাসার সেই এক ফোঁটা এখনও ভাই-বোনের চিরন্তন বন্ধনের প্রতীক হয়ে আছে।

 

ভাইফোঁটা কেবল একটি উৎসব নয়—এটি সম্পর্কের গভীর আবেগ, আস্থা ও সুরক্ষার প্রতীক।
যমুনার দেওয়া সেই প্রথম ফোঁটার মতোই, প্রতিটি বোনের হাতে আজও থাকে একই প্রার্থনা—“তুমি সুখে থাকো, অমঙ্গল তোমার কাছেও না আসুক।”

 

নিজের সংস্কৃতি নিজের ঘর।
চোখ রাখুন ব্লগে “শ্রীডক্টর”।


Spread the love

Leave a Reply

Skip to toolbar