...

পিঠে–পার্বণ: নস্টালজিয়া নয়, বাঙালির এক সচেতন ঐতিহ্য

Poush sankranti pithe puli sixteen nine

Poush sankranti pithe puli sixteen nine

 

পৌষ সংক্রান্তির ইতিহাস মূলত ভারতের প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। বাংলা অঞ্চলে পৌষ মাস মানেই ছিল ধান কাটার পরের সময়—যখন কৃষকের ঘরে নতুন ফসল আসে, খাদ্যের ভাণ্ডার ভরে ওঠে এবং দৈনন্দিন শ্রমের চাপ কিছুটা কমে। এই সময় সূর্যের অবস্থান পরিবর্তিত হয় এবং দক্ষিণায়নের শেষে উত্তরায়ণ শুরু হয়, যা প্রাচীন ভারতীয় ক্যালেন্ডারে একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন হিসেবে ধরা হতো। এই পরিবর্তন শুধু ধর্মীয় কারণে নয়, ঋতুচক্র বোঝা, কৃষিকাজের পরিকল্পনা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বাংলায় এই সময়ের উৎসব কোনও রাজকীয় বা আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান ছিল না; বরং তা গড়ে উঠেছিল গ্রামকেন্দ্রিক জীবনের বাস্তবতা থেকে। নতুন ধানের চাল, খেজুরের গুড় ও সহজ রান্নার পদ্ধতি ব্যবহার করে খাবার তৈরি করা ছিল স্বাভাবিক অভ্যাস। ধীরে ধীরে এই অভ্যাস থেকেই পিঠে–পার্বণের সামাজিক রূপ তৈরি হয়। নতুন ফসলকে সম্মান জানানো, ঋতুর পরিবর্তনকে গ্রহণ করা এবং পরিবারের সঙ্গে তা ভাগ করে নেওয়াই ছিল এই উৎসবের মূল ভাবনা। এইভাবে পৌষ সংক্রান্তি বাঙালির জীবনে কেবল একটি তারিখ নয়, বরং কৃষি, প্রকৃতি ও সমাজের এক যৌথ ইতিহাস হয়ে ওঠে।

 

ভাপা পিঠে, পাটিসাপটা বা ধীরে সেঁকা নানা রকম পিঠে আসলে ছিল শীতকালের উপযোগী রান্নার ধরন। ভাপের ব্যবহার গলা ও শ্বাসনালীকে আরাম দিত, তেলের পরিমাণ কম থাকত, ফলে হজমও সহজ হতো। তখনকার মানুষ হয়তো বিজ্ঞান জানত না, কিন্তু শরীর কী চায়, তা ঠিকই বুঝতে পারত।

পিঠে বানানো কখনও একার কাজ ছিল না। উঠোনে বা রান্নাঘরে একসঙ্গে চাল ভাঙা, পুর বানানো, আঁচ দেখাশোনা আর ফাঁকে ফাঁকে গল্প—এই পুরো প্রক্রিয়াটাই ছিল সামাজিক সম্পর্কের অংশ। কাজের মধ্য দিয়েই কথা হতো, হাসি হতো, আর পরিবার ও প্রতিবেশীর মধ্যে এক ধরনের স্বাভাবিক যোগাযোগ তৈরি হতো, যা আজকের ব্যস্ত জীবনে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।

সময়ের সঙ্গে আমরা পিঠে খাওয়ার অভ্যাসটা রেখে দিয়েছি, কিন্তু কেন এই সময়েই পিঠে, কেন এই উপকরণ, কেন এই রান্নার ধরন—এই প্রশ্নগুলো প্রায় হারিয়ে গেছে। ফলে পিঠে অনেক সময় শুধু শীতের নস্টালজিয়া বা বিশেষ দিনের মিষ্টি হয়ে দাঁড়ায়, তার আসল প্রেক্ষাপট আর গুরুত্বটা আড়ালেই থেকে যায়।

আজ যখন সারা বছর একই ধরনের খাবার, ফাস্ট ফুড আর তাড়াহুড়োর রান্না আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস হয়ে উঠেছে, তখন পিঠে–পার্বণ নতুন করে মনে করিয়ে দেয় যে খাওয়া শুধু পেট ভরানোর বিষয় নয়। ঋতু অনুযায়ী খাওয়া, ধীরে রান্না করা আর একসঙ্গে বসে সময় কাটানোর মধ্যেও এক ধরনের স্বাস্থ্য ও মানসিক শান্তি লুকিয়ে থাকে।

এই কারণগুলো বুঝতে পারলে পিঠে–পার্বণ আর শুধু অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকে না। তখন এটি হয়ে ওঠে এক সচেতন ঐতিহ্য, যা আধুনিক জীবনের মাঝেও আমাদের জীবনধারাকে একটু ধীর, একটু মানবিক আর একটু বেশি সংযুক্ত করে তোলে।

 

নিজের সংস্কৃতি নিজের ঘর।
চোখ রাখুন ব্লগে “শ্রীডক্টর”।

 

 


About Sri Yoga Center: A charitable trust in Kunarpur, Bankura devoted to Yoga, Ayurveda, Indology, and cultural research.
Know more
Official Blog
YouTube

Skip to toolbar