Posted on Leave a comment

সুস্বাদু সিঙ্গারা ও জন্ম বৃত্তান্ত

ঠাণ্ডা লুচি বারংবার ফেরত পাঠানোয় রাজবাড়ির হালুইকর অনুমতি চেয়েছিলেন রাজসভায় মিষ্টান্ন পাঠাতে। রাজচিকিৎসকের পরামর্শে মধুমেহ রোগাক্রান্ত রাজা অগ্নিশর্মা হয়ে শূলে চড়ানোর হুকুম দিয়েছিলেন হালুইকরকে। অনেক অনুনয় বিনয় করে নিজের প্রাণ রক্ষা করেছেন হালুইকর। রাজা আদেশ দিয়েছেন – হালুইকরকে তিনরাত্রের মধ্যে দেশত্যাগ করতে।
দ্বিতীয় রাত্রে হালুইকরের স্ত্রী ঠিক করেছে দেশত্যাগের আগে একবার দেখা করবে রাজার সাথে। সেইমতো তৃতীয়দিন সকাল বেলা রাজদরবারে এসে প্রণাম জানালো স্বয়ং রাজামশাইকে। রাজসভায় আসার কারণ জিজ্ঞেস করায়, রাজাকে জানায় – সে নাকি এমনভাবে লুচি তরকারি করতে পারে, যা রাজা আধঘন্টা বাদে খেলেও গরম পাবেন। এজাতীয় লুচি এবং তরকারি নাকি কিছুক্ষণ বাদে খাওয়াই দস্তুর।
সন্দিহান রাজা কিঞ্চিৎ কৌতূহলী হয়ে হালুইকরের স্ত্রীকে পাঠালেন পাকশালে। জানিয়ে দিলেন যখন রাজসভা থেকে খবর যাবে তৎক্ষণাৎ পাকশাল থেকে খাবার পৌঁছনো চাই। হালুইকরের স্ত্রী মৃদু হেসে মহারাজকে জানিয়েছিলো – খাদ্যদ্রব্য রাজসভায় তৎক্ষণাৎই পৌঁছবে, কিন্তু অনুগ্রহ করে তিনি যেন কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে খান – অন্যথায় মহামান্য রাজকীয় জিহ্বা পুড়ে যেতে পারে। বিস্মিত মহারাজের সামনে দিয়ে হাস্যমুখে হালুইকরের স্ত্রী চলে গেল পাকশালে।
রাজ-পাচক আলুর তরকারি তৈরি করে পাকশালে দাঁড়িয়ে কাঁপছেন, হুকুম এলেই লুচি ভাজতে হবে। ময়দার তাল মাখা রয়েছে হাতের সামনে। হালুইকরের স্ত্রী পাচককে কটাক্ষ করে বসলো ময়দার তাল নিয়ে। লেচি কেটে লুচি বেলে, কাঁচা ময়দার ভেতর লুচির জন্য তৈরি সাধারণ তরকারি ভরে দিয়ে, সমভুজাকৃতি ত্রিভুজের গড়ন বানিয়ে আড়ষ্ঠ রাজ পাচকের সামনে নিজের আঁচল সামলে শুরু করলো চটুল গল্প।
রাজাজ্ঞা আসতেই তরকারির পুর ভর্তি দশটি ত্রিভুজাকৃতির লুচির ময়দা ফুটন্ত ঘি ভর্তি কড়ায় ফেলে দিয়ে, নিমেষের মধ্যে সোনালী রঙের ত্রিভুজগুলি তুলে নিয়ে স্বর্ণথালায় সাজিয়ে নিজেই চললো রাজসভায়।
মহারাজ এরূপ অদ্ভুত দর্শন খাদ্যবস্তু দেখে স্তম্ভিত। হালুইকরের স্ত্রী অত্যন্ত বিনীতভাবে জানালো – খাদ্যদ্রব্যটির নাম সমভুজা। মহারাজ যেন সম্পূর্ণ বস্তুটি মুখে না ঢুকিয়ে একটি কামড় দিয়ে দেখেন – ঠাণ্ডা না গরম এবং অনুগ্রহ করে স্বাদটি জানান।
মহারাজ স্বাদ জানাননি। তিনি তিনছড়া মুক্তো মালা খুলে হালুইকরের স্ত্রীয়ের হাতে দিয়েছিলেন। রাজবাড়ির হালুইকরের দণ্ডাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছিলেন। প্রায় ছ’মাস পর হেসে উঠেছিলেন মহারাজ, শান্তি পেয়েছিলো তামাম প্রজাকুল।
মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র। ১৭৬৬ সালে কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার রাজ-হালুইকর, কলিঙ্গ তথা বর্তমান ওড়িষ্যা থেকে আগত গুণীনাথ হালুইকরের ষষ্ঠপুত্র গিরীধারী হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী দেবী আবিষ্কার করেছিলেন সিঙ্গাড়া।
শাক্ত সাধক, পরবর্তিকালে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি রামপ্রসাদ, স্বয়ং সন্ধ্যাহ্নিক সেরে প্রতিসন্ধ্যায় বসতেন একথালা সিঙ্গাড়া নিয়ে।
দোলপূর্ণিমার সন্ধ্যায়, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের দরবার থেকে বাইশটি সুসজ্জিত হস্তী ভেট নিয়ে গিয়েছিলো উমিচাঁদের কাছে – বাইশটি স্বর্ণথালা ভর্তি বাইশশোটি সিঙ্গাড়া।
ভারতীয় খাদ্য হিসেবে সিঙ্গাড়ার সাথে রবার্ট ক্লাইভের প্রথম সাক্ষাৎ হয়, এই মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রেরই সৌজন্যে।
সিঙ্গাড়ার জন্য ইতিহাস স্বীকৃতি দিয়েছে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে। নাম ভুলে গেছে তাঁর প্রধান হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী বেহারার।
ইংরিজিতে বলে, কমন সেন্স মেকস্ আ ম্যান আনকমন। ধরিত্রীদেবী সাধারণ বুদ্ধি খাটিয়ে আবিষ্কার করেছিলেন এই অসাধারণ খাদ্যদ্রব্যটির, যেটি সেই ১৭৬৬ সাল থেকে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলা তথা সারা ভারতে।
ঐতিহাসিকদের মতে, এর বহু আগে, নবম শতাব্দীতে পারস্যের অধিবাসীরা যব এবং ময়দার তালের সঙ্গে গাজর কড়াইশুঁটি রসুন ও মাংস মেখে সেঁকে খেতো, যাকে বর্তমান সিঙ্গাড়ার জনক হিসাবে ধরা হলেও, সুদূর পারস্য থেকে ভারতবর্ষে এসেও তাঁরা ময়দার তালে মাংসের কুঁচি ঢুকিয়ে সেঁকেই খেতেন। এরও বহুপরে তাঁরা ভারতবর্ষের উত্তরপূর্ব উপকূলে বিভিন্ন মশলা সহযোগে তৈরি আলুর তরকারি, ময়দার ভেতর ঢুকিয়ে ঘিয়ে ভাজার পদ্ধতিতে চমৎকৃত হ’ন।
ডায়বেটিক পেশেন্টদের ঘন ঘন খিদে পায়। চিকিৎসাবিজ্ঞান উন্নত হয়েছে। ডাক্তাররা বলছেন, অনেকক্ষণ অন্তর একসাথে প্রচুর পরিমানে না খেয়ে, ক্যালোরি মেপে কিছুক্ষণ অন্তর অল্পসল্প খাবার খেতে। কিন্তু সেযুগে ডাক্তারবাবুদের হৃদয় ছিলো বিশাল। মধুমেহ রোগীরা তখন তেল ঘি মশলা, ভাজা খেলেও তাঁরা রাগ করতেন না। নিশ্চিতভাবেই আজকের যুগে ডাক্তার বাবুরা আঁতকে উঠবেন যদি দেখেন কোনো ডায়াবেটিক পেশেন্ট প্রতিঘন্টায় সিঙ্গাড়া ওড়াচ্ছেন, তবু, আঁটকানো যায়নি সিঙ্গাড়াকে।
শহুরে অভিজাত পরিবারের বৈঠকখানায় মোটা গদির সোফায় বসা অতিথির থালাই হোক বা প্রত্যন্ত গ্রামের জরাজীর্ণ চায়ের দোকানের সামনে নড়বড়ে বাঁশের বেঞ্চে রাখা তেলচিটে কালো ভাঙ্গা বেতের চুবড়ি – বিকেল সাড়ে চারটেই হোক বা সকাল পৌনে দশটা, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রধান হালুইকরের স্ত্রীর উদ্ভাবনটি সর্বত্র সর্বদা সর্বগামী।
যা রাজসভায় রাজ-সম্মুখে পরিবেশিত হয়, তার কৌলীন্য প্রশ্নাতীত হবে – এই তো স্বাভাবিক।
ভাষাবিদদের মতে, সমভুজা–> সম্ভোজা–> সাম্ভোসা–> সামোসা।
মতান্তরে, সমভুজা–> সম্ভোজা–> সিভুসা–> সিঁঙুরা(নদীয়ার কথ্যভাষার প্রভাবে)–> সিঙ্গাড়া।
সংগৃহীত।
Posted on Leave a comment

চরক এবং প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্র

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী

চরক প্রাচীন চিকিৎসার কৃৎকৌশল ও এর বিজ্ঞান সম্পর্কে অন্যতম অবদান রাখেন যা একটি চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে একটি জীবন প্রণালী হিসেবে তৎকালীন ভারতে বিকশিত হয়েছিল। তিনি প্রাচীন ভারতের অন্যতম চিকিৎসাগ্রন্থ ‘চরক সংহিতা’র রচয়িতা হিসেবে খ্যাত হয়ে আছেন। চরক ও শুশ্রুত সংহিতা এ’দুটোর মধ্যে প্রথমোক্তটি অপেক্ষাকৃত প্রাক্তন এবং এটি মূলতঃ মেডিসিন নিয়ে কাজ করেছে, তবে এতে সার্জারীরও একটি সংক্ষিপ্ত অধ্যায় রয়েছে।
চরককে কাশ্মীরের অধিবাসী মনে করা হয়। চরকের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ মতেন স্বাস্থ্য এবং রোগ বহু ক্ষেত্রে পূর্ব নির্ধারিত নয়, বরং মানুষের কর্মকান্ড এবং জীবনযাত্রার উপর এটা বহুলাংশে নির্ভরশীল। তাঁকে “মেডিসিন চিকিৎসা”র জনক হিসেবে অভিহিত করা হয়। অন্যদিকে সুশ্রুত ছিলেন মূলতঃ শল্যবিদ। স্বভাবতঃই কয়েক হাজার বছর আগে উভয়ের রচিত গ্রন্থের ধরণও ভিন্ন। চরকের মেডিসিন বিষয়ক ‘চরক সংহিতা’ আর সুশ্রুতের শল্যবিদ্যা বিষয়ক ‘সুশ্রুত সংহিতা’।
চরক সংহিতায় শরীরের নানা অভ্যন্তরীণ ও স্বাভাবিক কর্মকান্ড (ফিজিওলজি), রোগের উৎপত্তি ও কারণ(ইটিয়োলজি), ভ্রুণ তত্ত্ব (এম্ব্রায়োলজি), হজমপ্রক্রিয়া (ডাইজেস্সান) বিপাক প্রক্রিয়া (মেটাবোলিজম), রোগ প্রতিরোধের বিষয় (ইম্যুনিটি) সহ শ্রেনীবদ্ধ ভাবে শরীর বিষয়ক প্রায় সকল মূল বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে।
জেনেটিক্স্ এর একবারে প্রাথমিক পর্যায়ের ধারণার সন্ধানও এ সংহিতায় বর্তমান। চরক সংহিতায় মোট আটটি অংশ আছে। সুত্র স্থান (স্থান মানে গ্রন্থ),নিদান স্থান, বিমান স্থান, শরীর স্থান, ইন্দ্রিয় স্থান, চিকিৎসা স্থান, কল্প স্থান, ও সিদ্ধি স্থান। আটটি অংশ সম্বলিত এ গ্রন্থে ১২০টি অধ্যায় আছে, ১২০০০ শ্লোক ও ২০০০ হাজার ঔষধের বর্ণনা আছে। শরীরের প্রায় সকল অংশের অসুস্থতা নিরাময়ের জন্য প্রাকৃতিক ঔষধ নির্ভর চিকিৎসার বর্ণনা আছে। ‘সূত্র স্থান’ হচ্ছে চিকিৎসার সাধারণ নিয়ম সংক্রান্ত গ্রন্থাংশ। ত্রিশটি অধ্যায় সম্বলিত এ অংশটি সুস্থ জীবনযাপন, ঔষধি সংগ্রহ এবং এগুলোর ব্যবহার, উপসম, খাদ্য এবং চিকিৎসকের কর্তব্য বিষয়ে লিখিত। ‘নিদান স্থান’ তথা প্যাথলজির এর আটটি অধ্যায়Ñএ আটটি মুখ্য রোগের প্যাথলজি বর্ণনা করা হয়েছে। বিমান স্থান এর আটটি অধ্যায়ে রয়েছে প্যাথলজি, রোগ নির্ণয়ের চিকিৎসা পাঠক্রম বিষয়ের নানা যন্ত্রপাতি ও আচরণ বিধি।
শরীর গ্রন্থÑএর আটটি অধ্যায়ে শরীরের এনাটমি এবং এম্ব্রায়োলজি বর্ণিত হয়েছে। ইন্দ্রিয় স্থান সংক্রান্তÍ – বারোটি অধ্যায়ে বি¯তৃত রোগ নির্র্ণয়, তার অনুভূতি বা ইন্দ্রিয়Ñনির্ভর পরিণাম এতে বর্ণিত। চিকিৎসা স্থান এর এতে ত্রিশটি অধ্যায় রয়েছে যা বিশেষ ধরনের কিছু চিকিৎসার কথা বলে। ফার্মাকোলজি ও টক্সিকোলজি বিষয়ক ‘কল্প স্থান’ এর বারোটি অধ্যায়। সিদ্ধি স্থান চিকিৎসায় সাফল্য বিষয়ক Ñ বারো অধ্যায় সম্বলিত এই অংশে ‘পঞ্চকর্মের’ সাধারণ সূত্রগুলোও বর্ণনা করে।এই পঞ্চকর্ম হচ্ছেÑ বমন, বিরেচন (জোলাপের মাধ্যমে মলত্যাগ করানো), বস্তি তথা বস্তী (প্রস্রাব বা পায়খানা করানো) নস্য, রক্তমোক্ষন।
চরক সংহিতার চিকিৎসা স্থানের সতেরোটি অধ্যায়, পুরো ‘কল্পস্থান’ এবং ‘সিদ্ধি স্থান’ পরবর্তীতে দ্রুধপদ কর্তৃক অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। এ সংহিতার ‘সূত্রস্থান’ মূলতঃ আয়ুর্বেদের মৌলিক ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করে। চরক সংহিতা যে সমস্ত অনবদ্য বৈজ্ঞানিক অবদান রেখেছে তার মধ্যে রয়েছেÑ রোগের কারণ এবং এর চিকিৎসা নির্ধারণে একটি যৌক্তিক উপায় নির্মাণ। রোগীকে পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে বাস্তবানুগ প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্তকরণ ও অনুসরণ। সংহিতা এ বিষয়ে গুরুত্ব নির্দেশ করে জোর দেয় যে, রোগীর প্রত্যক্ষ নিরীক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যদিও কখনো কখনো এর সঙ্গে সংমিশ্রিত হয় সত্ত্বার প্রকৃতি ও জ্ঞানÑসংক্রান্ত দর্শন শাস্ত্র তথা অধিবিদ্যা। প্রাচীন ভারতে সফল চিকিৎসাÑ চিকিৎসক, ঔষধ ও পথ্য, নার্স এবং রোগীÑ সবার উপর যুগপৎ নির্ভরশীল বলে উল্লেখিত; নিরাময়ের ক্ষেত্রে সবার দায়িত্ব রয়েছে। সংহিতা এ বিষয়ে জোর দেয় যে, রোগের সকল প্রকার প্রমাণাদির মধ্যে যা চোখে দেয়া যায় সেই প্রমাণ বা লক্ষণই রোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকের শিক্ষাগত যোগ্যতাসমূহের ক্ষেত্রে চিকিৎসা বিজ্ঞানের তত্ত্বগত জ্ঞান সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা অর্জন ও অনুধাবন ক্ষমতা, বিবিধ বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জন, দক্ষতা, পরিচ্ছন্ন থাকা সহ বিবিধ গুণাবলী থাকা প্রয়োজন। ঔষধের উত্তম মানÑ সম্পন্নতা ও কার্যকারিতা,একই ঔষধের বিবিধ ব্যবহার ও প্রয়োগ সম্পন্নতা, পর্যাপ্ত সরবরাহ ও প্রাপনীয়তা বিদ্যমান থাকা সমীচীন। রোগীর কি কি গুণাবলী থাকা উচিত চরক তাও বর্ণনা করেছেন: ভালো স্মৃতিশক্তি, উপসর্গসমূহ বর্ণনার সাহস ও ক্ষমতা থাকা, চিকিৎসকের পরামর্শ যথাযথভাবে মেনে চলা।
চরক মানব শরীরের এ্যানাটমি অধ্যয়ন করেন। তাঁর হিসেবে দাঁত সহ মোট হাড়ের সংখ্যা হচ্ছে ৩৬০টি। তার মতে হৃদপিন্ড শরীরের কেন্দ্র যা সারা শরীরের সঙ্গে অন্ততঃ তেরোটি চ্যানেলের মাধ্যমে সংযুক্ত। তাঁর মতে এছাড়া ছোট বড়ো আরো অসংখ্য বিভিন্ন আকারের পরিবহনকারী পাইপ রয়েছে যার মাধমে শরীরে পুষ্টিকর বস্তুসমূহ সরবরাহ করা হয়, অন্য দিকে শরীরে থেকে দূষিত পদার্থ সরিয়ে নেয়া হয়। তাঁর মতে যে কোন মূল ধমনী বা মূল চ্যানেল বা মাধ্যমÑএ কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে তা থেকে রোগের উৎপত্তি হয় এবং বিকলাঙ্গতা সৃষ্টি হয়।
চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে চরক তাঁর সংহিতায় বলেনÑ ‘জ্ঞান ও অনুধাবন ব্যতিরেকে তথা এই আলোকবর্তিকা বা লন্ঠন ব্যতিরেকে মানব শরীরে প্রবেশ করলে মানুষের চিকিৎসা অসম্ভব।’ এছাড়া তিনি রোগ প্রতিরোধের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। প্রাথমিকভাবে ‘রোগ প্রতিরোধ তার চিকিৎসার চাইতে উত্তম’Ñ এই শাশ্বত বাক্যটির সঙ্গে চরক তাঁর চিকিৎসক জীবনের প্রথম থেকেই উচ্চারণ করেছিলেন। বলতে গেলে একই ধারণা পরবর্তীতে আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের ভিত্তি তৈরী করেছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও বলেÑ ‘প্রিভেনশন্ আজ বেটার দ্যান কিওর’, আর বলে শরীরের হোমিওস্টেটিক ইমব্যালেন্স্ অর্থাৎ শরীরের নানা অংশের কর্মকান্ডের সুসামঞ্জস্যের অভাবই(চরকের ভাষায় ‘দোষ’ এর অসামঞ্জস্যতাই) অধিকাংশ রোগের জন্মদাতা। একথা সর্বজনবিদিত এবং তা বারম্বার উল্লেখিতও হয়েছে যেÑ রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগের মূল কারণ নিরসন ভারতীয় প্রাচীন চিকিৎসার ব্যবস্থায় এর ঐতিহ্যের মূল সুর হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে। তাছাড়া, প্রকৃতির ঋতুসমূহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শরীরকে সঙ্গতঃ করতে হবেÑ এ কথাও তাঁর উল্লেখিত। চরক বলছেন একজন চিকিৎসক প্রথমে সবকিছু পড়ে দেখা অনুধাবন করা এবং বছরের বিভিন্ন ঋতুকালসমূহও অনুধাবন করা উচিত এবং তারপরেই ঔষধের ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা উচিত।
চরক তাঁর সংহিতায় উল্লেখ করেন যে চিকিৎসকরা অথর্ববেদ সংলগ্ন থাকা বিধেয়। হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ অথর্ববেদ লৌহ যুগের(খ্রী.পূ ১২০০Ñ খ্রী.পূ.২০০) প্রথম দিকে রচিত হয়েছিল বলে ধরা হয়। এটা ভারতের চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রথম গ্রন্থ। অথর্ববেদ এ রয়েছে বিবিধ রোগ নিরাময়ের জন্য নানা উদ্ভিদ নির্ভর চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র। তৎকালের নিকটÑপ্রাচ্যে প্রচলিত নিয়মে মন্ত্রাদির সাহায্যে ভুতপ্রেত দূরীভূত করা ও জাদু বিদ্যা এর একটি অংশ। অথর্ব বেদের সংহিতা অংশে রোগ নিরাময়ের জন্য ১১৪টি স্ত্রোত্রগীত বা জাদুবিদ্যার মন্ত্রোচ্চারণমূলক শ্লোক আছে। অসুস্থতায় লতা পাতা বৃক্ষমূল বাকল থেকে তৈরী এই ভেষজ ঔষধির ব্যবহার নিয়ে পরে সৃষ্টি হয় আয়ুর্বেদের ব্যাপক অংশ। অর্থাৎ, বেদ পরবর্তী ভারতীয় সমাজে প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থাকে বলা বলা হয় আয়ুর্বেদ (আযুর্বেদ মানে দীর্ঘ জীবনের জন্য পূর্ণ জ্ঞান)। এর দুটি মুখ্য গ্রন্থ হচ্ছে শুশ্রুত ও চরক সংহিতা, শুশ্রুত ও চরক উভয়ই অনেকটা সমসাময়িক, খ্রীপূ ৬ষ্ঠ শতকে এদের বিচরণ।
যদিও ভারতে চিকিৎসার প্রাথমিক ভিত্তি প্রচলিত ভেষজ চিকিৎসার উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠে তবে তার সঙ্গে যুক্ত হয়Ñ চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যাপক বাস্তব অভিজ্ঞতা লব্ধ ধ্যান ধারণা, ব্যাপক তাত্ত্বিক ধ্যান ধারণার সংযুক্তি, রোগের পরবর্তী শ্রেণী বিন্যাস, খ্রীপূ ৪০০ অব্দ থেকে নতুন নতুন ঔষধি ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় অবতার বুদ্ধদেব সহ বিভিন্ন চিন্তাবিদদের নানা সংযোজনা। আযুর্বেদের কেন্দ্রীয় বিষয়গুলো তৈরী হয়ে উঠার ক্ষেত্রে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। শরীর বিষয়ে একটা ব্যালেন্স একটি ভারসাম্যতা মেনে চলার উপর গুরুত্ব আরোপিত হয়েছে। প্রাকৃতিক আকাংখাগুলোকে দমন করাকে অস্বাস্থ্যকর এবং তা দেহতন্ত্রকে অসুস্থতার দিকে ধাবিত করে বলে রায় দেয়া হয়েছে, তবে সাবধান বাণী উচ্চারিত হয়েছে প্রাকৃতিক চাহিদাসমূহের ক্ষেত্রে যেমন খাদ্য গ্রহণ, ঘুম, যৌন জীবন নিয়ে সীমার মধ্যে থাকার জন্যে।
এই মন্তব্যসমূহ আজকের দিনে সাদামাটা আটপৌরে অনুন্নত প্রাথমিক মনে হতে পারে, তবে এই অভিনব মন্তব্য চরক কর্তৃক আজ থেকে অন্যূন দুই সহস্র বৎসর আগে উচ্চারিত হয়েছিল বিধায় যুগান্তকারী এবং মৌলিক। চরক সংহিতা নামক আকর গ্রন্থে এ ধরণের বহু মন্তব্য রয়েছে যা আজকের দিনেও শ্রদ্ধার সাথে মান্য করা হয়। এর কোন কোনটি ফিজিওলজি, ইটিওলজি এবং এম্ব্রায়োলজি বিষয়ক। চরককেÑ হজম, বিপাক, এবং ইম্যুনিটি বিষয়ে লেখালেখির অন্যতম প্রাচীন চিকিৎসক বলে ধরা হয়।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্র চরক সংহিতা থেকে প্রভূতভাবে নানা মতধারা সংগ্রহ করতঃ আত্মস্থ করে। চরক জেনেটিক নিয়েও লিখেন এবং সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারক হিসেবে কোন্ কোন্ বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তার আলোচনা করেন। জন্মান্ধতাকে পিতা মাতার ক্রটির চাইতে ডিম্বাণু বা শুক্রবীজের ভূমিকা তথা ভ্রুণগত বিষয়ের উপর জোর দেন বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া চরক সংহিতায় ফিজিওলজি, ইটিওলজি এবং এম্ব্রায়োলজি সম্পর্কেও ধারণা দেয়া হয়েছে।